শাকিল মৃত্যুর রহস্য বাড়ছেই, বের হয়ে আসছে সুনির্দিষ্ট দিক

4194

হাসান বাবু/লাইভঃ

a37acb5fcf090cf15c51fe259b64e524-58468b18b3997

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বিশেষ সহকারী কবি ও লেখক মাহবুবুল হক শাকিল নেই পৃথিবীতে। চলে গেছেন অভিমান করে -এমন প্রাথমিক খবরের গুঞ্জন চলছিল, স্ট্রোক করে মারা গেছেন- এমন খবরের চাউরও আছে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সব কিছু দেখার পরেই তো বলা যাবে আসলে তাঁর মৃত্যুর রহস্য কি !তবে শাকিল মৃত্যুর নেপথ্যে একটা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য দিক আছে। সেটা এখন আর কারো কাছে অজানা নয়। সেটি না হলে তিনি কেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলবেন, 

15267894_1209293702493862_9180690267066070480_n

 এই পোষ্টটি করেন তিনি মারা যাবার দশ ঘন্টা আগে।
অন্যদিকে শাকিল তাঁর সাম্প্রতিক কবিতায় লিখে গেছেন তাঁর জীবনের শেষভাগের আদ্যপান্ত। কবিতাটিতে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আলেখ্য বর্ণনা করেছেন। লিখেছেন-

আমি চলে যাবার পরেও
মাহবুবুল হক শাকিল

আমি চলে যাবার পরেও ঢাকার রাস্তায় থাকবে
নিত্যদিনের যানজট, রিকশার টুংটাং, পথচলতি মানুষের মিছিল,
মফস্বল থেকে আসা বোকা মুখের বিস্ময়।
রাজনীতির তুমুল তর্ক থাকবে,
ক্ষমতার পালা-বদল থাকবে,
চলমান থাকবে বহুতল ভবনের নির্মাণ।
থাকবে আজকের মতোই ভালবাসা-বাসি
বিরহী প্রেমিকের বিষন্নতা, অভিমানী প্রেমিকার কান্না।
চলে যাবার পরেও থেমে থাকবেনা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত,
জন্ম এবং সৎকার।
যে প্রিয় বইয়ে বারবার ছোঁয়াতাম তৃষার্ত আঙুল
তেমনি আর কারো আঙুল ছুঁয়ে যাবে আরেকটি বইয়ের পাতা।
শূন্য থাকবেনা পানশালায় প্রতিদিনের নির্ধারিত চেয়ার
জানালার পাশে, যেখানে বসে স্থবির আমি চলাচল শহর দেখতাম।
আমার মা সন্তান বিয়োগের দুঃখে চোখ ভাসাবেন জলে,
প্রাকৃতিক নিয়মেই; দীর্ঘতর হবে
আমার পিতার জায়নামাজে বসে থাকার স্থিতিকাল।
একমাত্র সহোদর নিঃসঙ্গ হতে হতে একসময় বুঝে যাবে
একাকিত্বই জীবনের মৌলিক ভ্রাতা, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়।
মেনে নিতে কষ্ট হবে প্রিয়তমা কন্যার ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন
আর স্বপ্নজুড়ে আমাকে দেখে সারারাত জেগে থাকবে বোবা কান্না নিয়ে।
একসময়ে সেও বড়ো হবে,
পিতাকে নিয়ে সযতনে রাখা কষ্ট-স্মৃতি
ফিকে হয়ে আসবে নতুন স্বপ্নের উৎসবে।
কোন একদিন সুখী হবে আমার আত্মজা।
চলে যাবার পথে আমি দূরদ্বীপবাসিনী দুটি চোখ দেখি,
সেই চোখে আমি কোন কোন কান্না দেখিনা।
পেশাদারি ব্যস্ততা দেখি,
সংসার সাজানোর নিত্য-নতুন আয়োজন দেখি।
কেবলমাত্র দুর্লভ অবসরে
মীর্জা গালিব বা রবীন্দ্রনাথ যখন তার সঙ্গী তখন টের পাই
আমার চলে যাওয়ার পথে এক বিরল দীর্ঘশ্বাস,
মুক্তার দানার মতো অশ্রুবিন্দু।
আমি চলে যাবার পর পৃথিবীর আর কোন ভাবান্তর দেখি না।

—-

যেটাই হোক একজন শাকিলের মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হওয়ার দরকার। তিনি মনের দিক হতে প্রেমী কিন্তু অভিমানী ছিলেন। নিজের স্ত্রীকেই বলেছেন, কোনো একদিন সুখী হবে আমার আত্মজা। হয়তো তিনি জীবনের নদীতে একটু সুখের জন্য পর নারীতে ডুবে যেতে চাইতেন কিন্তু অগাধ ভালবাসা ছিল তাঁর পরিজনের সেই পুরোনো স্মৃতির রোমন্থনে থেকে এক অপলক শাশ্বত দৃষ্টিতে ভেসে। তিনি জানতেন, যা করছেন তা অভিমানের আয়োজনে, প্রেম সেতো ওই ছোট্ট সংসারের প্রিয় দুহিতাদের জন্যই।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের মৃত্যুর রহস্যজট খুলতে মাঠে নেমেছে পুলিশের বিশেষ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মঙ্গলবার দুপুরে গুলশানের সামদদো জাপানি রেস্তোয়া থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বিকাল সাড়ে ৩ টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টা পর্যন্ত সিআইডির ৪ টি দল ঘটনাস্থল থেকে ২ ব্যাগ আলামত সংগ্রহ করে নিয়ে যায়।

পুলিশের একটি সূত্র  জানায়, সোমবার রাত সাড়ে ৯ টার দিকে সামদাদো রোস্তোয়ায় আসেন মাহবুবুল হক শাকিল। এসময় তার সঙ্গে এক বন্ধুও ছিলেন। সিসি টিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সেই বন্ধুকে চিহ্নিত করা এবং তিনি কতক্ষণ শাকিলের সঙ্গে ছিলেন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের মধ্যে রহস্যজনক কোনো ঘটনা ঘটে খাকলে সেটিও বের করা হবে।

তবে শাকিলের মৃত্যু রহস্য নিয়ে এ মুহূর্তে ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার আগে এবং পুলিশের তদন্তের স্বার্থে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি সূত্রটি।

এদিকে বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ  বলেন, “ইন্টারনাল বা এক্সটারনাল কোনো ইনজুরির চিহ্ন আমরা পাইনি।”

ঠিক কী কারণে শাকিলের মৃত‌্যু হয়েছে জানতে ভিসেরা পরীক্ষার জন‌্য পাকস্থলি ও পেশির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, “উনার হার্ট স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বড় ছিল। কোর্ডিয়াক অ‌্যারেস্ট হয়েছিল কি না জানতে আমরা নমুনা হিস্টোপ‌্যাথলজিতে পাঠিয়েছি।”

অপরদিকে পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, সামদাদো রেস্তোয়ায় আবাসিকভাবে থাকার কোনো নিয়ম নেই। তবে মাহবুবুল হক শাকিল প্রায় সময়ই এখানে রাতে অবস্থান করতেন। এখানে তার নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় আড্ডা দিতেন।

এদিকে, শাকিলের মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশ-সিআইডি খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ। সামদোদো রেস্টুরেন্টে শাকিলের লাশ দেখতে এসে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বুধবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শাকিলের লাশের ময়নাতদন্ত করা হবে। বিষয়টি আপাতত সিআইডি-পুলিশ খতিয়ে দেখছে।

এ ঘটনার তদন্তে সামদাদো রেস্টুরেন্টের ৭ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

প্রশ্নটা এখন কেন্দ্রিভুত করা যায় ফেসবুকে দেয়া সেই স্ট্যাটাস টা কে নিয়ে। প্রাসঙ্গিক হবে তা পর্যালোচনা করলে। তিনি বলছেন, ঘাতকের কথা। বলছেন, অসাধারণ পরিপক্ক  এক হত্যা ষড়যন্ত্রের কথাও। বলছেন, যিনি এর নেপথ্যে সেও তাঁর ঘনিষ্ঠজন। শাকিল নিজেও তো ক্ষমতাধর ছিলেন। তাহলে তাঁর চেয়েও প্রভাবশালী কেও কি সত্যই তাঁকে দুনিয়া ছাড়তে বাধ্য করালেন? নাকি কবি মনের যাতনায় সামাজিক রাজনৈতিক ওই চাপকেই তিনি ‘ঘাতক’ অর্থে ব্যবহার করেছিলেন? সেটিও কিন্তু উন্নত দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ আছে।

শাকিল জানতেন, তিনি তাঁর পরিবারকে ঠকাচ্ছেন। রাতের পর রাত কেন নিজের আবাস ছেড়ে ওই হোটেলে পড়ে থাকতেন? আগের দিন রাতে আসা ওই বন্ধু বা ঘাতকের লিঙ্গ কি ? তিনি কি পুরুষ, না স্ত্রীলোক ছিলেন ? এমন জিজ্ঞাসায় অযুত প্রশ্ন এখন সজ্জন শাকিল কে ঘিরে। হ্যাঁ, প্রয়াত হয়ে। ছেড়েছেন পৃথিবী। হয়েছেন গ্রহান্তরীত। কিন্তু অমীমাংসিত জিজ্ঞাসার বাণে ভাসছে এই মৃত্যু। বাড়ছে রহস্য।

বাংলাদেশের একজন দার্শনিক বলেছেন, “তুমি অযাচিত মোহে নিমজ্জিত থাকলে মাশুল দিতেই হবে; নিষিদ্ধে সুখ মধুর থাকে কিন্তু জীবনের ওই খেলাটা ফাউল করার মতো- পেনাল্টি যে দিতেই হবে।”

হা/লা১৭০০

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY