প্রশ্ন উঠেছে মুফতী ইজহার এসেট নাকি লাইবেলেটিস ?

273

নিজেস্ব প্রতিবেদক :
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামের জোটে থাকা না থাকা নিয়ে গুঞ্জন যখন সর্বত্র তখনই নেজামে ইসলাম নামে অনিবন্ধিত একটি দলকে জোটে নেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এই দলের প্রধান মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছেন।

দীর্ঘদিন পর হঠাৎ করেই মুফতি ইজহারুলের বিএনপি জোটে সম্পৃক্ত হওয়া নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠেছে- কে এই ইজহারুল ইসলাম, কী ছিল তার অতীত? এ নিয়েও জল্পনার শেষ নেই।

দেশে জাতীয়তাবাদী ধারার অনেক দল যখন ২০ দলীয় জোটের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবেক কাজ করতে আগ্রহি তখন তাদের পাশ কাটিয়ে হঠাৎ কেন মুফতী ইজহারের নিবন্ধিনহীন দলকে জোটে নেয়া হচ্ছে এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জোট শরিকদের মধ্যে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এক সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট শরিক শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক ও মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। ২০০১ সালে জোট সরকার গঠিত হওয়ার পর ইসলামী ঐক্যজোট ভেঙে গেলে তিনি মুফতি আমিনীর নেতৃত্বাধীন অংশের মহাসচিব হন। পরবর্তীতে তিনি নিজেই ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান হয়ে যান। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে অংশ নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ১/১১ এর সময় জোট সরকারের কঠোর সমালোচক হিসেবে পর্দায় আর্বিভূত হন।

২০১৩ সালের ১০ জুলাই চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদরাসায় ভয়াবহ গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন নিহত হয়। আহত হয় বেশ কয়েকজন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইজহারপুত্র মুফতি হারুনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক হারুনের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দী ছিলেন।

মুফতি ইজহারকেও পরবর্তীতে একই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তিনিও দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। গ্রেফতারের পর গোয়েন্দারা তাকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে এলে তিনি দুই আঙুল তুলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, আমি মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা।

লালখান বাজার মাদরাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরপরই পালিয়ে যায় মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী। প্রায় দুই বছর পলাতক থাকার পর গত কয়েকদিন আগে তিনি লালখান বাজার মাদরাসায় ফিরে আসেন। মাদরাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা তিনটি মামলায় মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হারুন ইজহারসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। বিস্ফোরক, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ও একটি হত্যাসহ তিনটি মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। মামলাগুলোতে জামিন না নেয়ায় ইতোমধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে ইজহারের বিরুদ্ধে।

সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুফ্তি ইজাহারুল ইসলামের পরিচালনাধীন লালখান বাজারে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদরাসা ঘিরে গড়ে উঠেছিল আন্তঃদেশীয় জঙ্গিদের ঘাঁটি। যেখান থেকে ২০০৯ সালের শেষ দিকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার ছক তৈরি হয়েছিল। এ হামলা পরকিল্পনা করেছিল ভারতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন লস্কর ই-তৈয়্যবা। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইজহারুল ইসলামের ছেলে হারুন ইজহার। ফের সেখান থেকেই বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ছক কষা হয়েছিল বলে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে খবর রয়েছে।

২০০৯ সালের শেষ দিকে খবর পাওয়া যায়, যেকোনো সময় ঢাকাস্থ দুটি দূতাবাসে জঙ্গি হামলা হতে পারে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ও একটি টেলিফোন কলের সূত্র ধরে জানা যায়, হামলার ছক মুফতি ইজহারের মাদরাসায় বসেই করা হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত আন্তঃদেশীয় কয়েকজন জঙ্গি মুফতি ইজহারুলের মাদরাসায় অবস্থান করছিলেন। এ তথ্য পেয়েই গোয়েন্দা পুলিশ ওই মাদরাসায় অভিযান চালায়, গ্রেফতার করা হয় ইজহারপুত্র হারুন ইজহার এবং দক্ষিণ ভারতীয় সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়্যবার সদস্য ভারতীয় নাগরিক শহিদুল, সালাম, সুজন ও আল আমিন ওরফে মইফুলকে।

সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ওই অভিযানকালে গোয়েন্দা পুলিশ হারুন ইজহারের কক্ষ থেকে একটি ল্যাপটপ জব্দ করে। পরবর্তীতে ওই ল্যাপটপে মার্কিন ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। পুলিশের অভিযান শুরুর আগে সেখান থেকে পালিয়ে যায় লস্কর-ই-তৈয়্যবার অন্যতম শীর্ষনেতা টি নাসির ও সরফরাজ। একই বছরের ৬ নভেম্বর কুমিরা সীমান্ত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দুই ভারতীয় জঙ্গি গ্রেফতার হয়। ওই দুই জঙ্গি ভারতের বেঙ্গালুরু কম্পিউটার সিটিতে বোমা হামলাসহ বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত। তারা ছিলেন ভারতে মোস্ট ওয়ানটেড। গ্রেফতার এড়াতে দুই জঙ্গি সদস্য দুবাই হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় মুফতি ইজহারের মাদরাসায়।

এর আগে রাউজান রাবার বাগান গোদারপাড় এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় হুজির প্রশিক্ষণকালে অভিযান চালিয়ে জিহাদি বই ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে র্যাব। এ ঘটনায় বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলায় মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজনকে আসামি করা হয়।

২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগের র্যাব-৭ এর হাতে দুই সহযোগীসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন আমির মাওলানা ইয়াহিয়া ওরফে বর্দ্দা (৪৬) এবং তার দুই সহযোগী মো. বাহাউদ্দিন (২২) ও ইয়ার মোহাম্মদকে (৫০) গ্রেফতার করে র্যাব। র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াহিয়া জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামে হুজির আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদরাসায় সাংগঠনিক অফিস খোলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগে আটক হওয়া কয়েকজন জঙ্গি জানায়- তারা মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদরাসাতেই ট্রেনিং নিয়েছিল।

মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম পার্টি ২০ দলীয় জোটের শরিক হচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে জোটের একজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জোটের যোগ বা বিয়োগ করার অধিকার প্রধান দল বিএনপি। অতীতেও জোটের কাউকে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে জোট শরিকদের মতামত নেয়া হয়েছে বলে আমার জানা নাই। শুধু বিএনপি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে চাপিয়ে দিয়েছে। এই ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হবে।

তিনি বলেন, তবে, এই দলটি জোটে যোগ দেয়ার মধ্যদিয়ে বিএনপিকে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতার দায়ও গ্রহণ করতে হবে। আমরা ছোট দল বলেই হয়তো বিএনপি আমাদের সাথে পরামর্শ করে না। মুফতি ইজহারের সাথে বিএনপি মহাসচিবের বৈঠকের পূর্বেই তার উচিত ছিল অন্যদলগুলোর সাথে পরামর্শ করা ও তার সম্পর্কে জানা। তিনি এটি না করে বরং অজ্ঞতার ও অহংবোধের পরিচয় দিয়েছেন। মুফতি ইজহারের কুকর্মের ও জঙ্গিবাদের দায়ভার বিএনপি গ্রহণ করলেও জোটের অনেকে সেই দায়ভার গ্রহণ করবে কি না প্রশ্ন চলে আসবে। এর মধ্যদিয়ে প্রকারান্তরে বিএনপি আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার পথকেই প্রসস্থ করছে বলে মনে হয়।

জোটের এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, এর আগেও বিএনপি দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী দলের একাংশকে জোটে এনেছে। বরং সত্য হলো যার নেতৃত্বে সাম্যবাদী দল বিএনপির জোটে এসেছে তিনি সেই দলের বড় কোনো নেতা ছিলেন না। ছিলেন একটি জেলার সম্পাদক। যা রাজনৈতিক অঙ্গনে হাসির খোড়াক জুগিয়েছিল। মূল ইসলামী ঐক্যজোট যখন জাতীয় সম্মেলনের মধ্যদিয়ে ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করছে তখন বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে নতুন ইসলামী ঐক্যজোট জন্ম দেয়া, শেখ আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ভাসানী জোট থেকে বের হয়ে গেলে কল্যাণ পার্টির একটি জেলা সহ-সভাপতিকে চেয়ারম্যান করে নতুন ন্যাপ ভাসানী জন্ম দেয়া রাজনৈতিক দেওলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ। মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম পার্টিকে ২০ দলীয় জোটে আনলে তা হবে আত্মঘাতী ও রাজনৈতিক দেওলিয়াত্বে বহিঃপ্রকাশ।

প্রশ্ন উঠেছে মুফতী ইজহার এসেট নাকি লাইবেলেটিস ?

তবে এত বিতর্ক থাকা স্বত্ত্বেও মুফতি ইজহারুল ইসলামকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে নেয়া হবে কি না- এটা আজ রাতে জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকের পর জানা যাবে।

এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান গণমাধ্যমকে জানান, জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ম্যাডামের আজকের বৈঠকে মুফতি ইজহারুল ইসলামের দলকে ২০ দলীয় জোটে নেয়া-না নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এ জন্যই বৈঠকটি ডেকেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

সূত্র জানায়, মুফতি ইজহারকে জোটভুক্ত করার বিষয়ে চট্টগ্রাম এলাকার এক নেতা যিনি জোটেও আছেন, তিনি প্রধান ভুমিকা পালন করছেন। নিজের পিঠ বাচাতে মুফতি ইজহার ওই নেতাকে ব্যবহার করে জোটবদ্ধ হতে চাইছে বলে জানান তারা।

(লাইভবার্তা২৪ডটকম /জিএম/ জানুয়ারী ২৮, ২০১৮)

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY