আজ আনোয়ার জাহিদের ৮৩ তম জন্মবার্ষিকী

74

মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা :
আজ ১২ই জুন ২০১৮ জাতীয় নেতা, এনডিপি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী, প্রখ্যাত সাংবাদিক জননেতা আনোয়ার জাহিদের ৮৩ তম জন্মবার্ষিকী।

প্রখ্যাত সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী আনোয়ার জাহিদ ঝিনাইদহ শহরের দাড়িয়া গোবিন্দপুর গ্রামে ১৯৩৫ সালে ১২ জুন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। লেখাপড়া করেন ঝিনাইদহ উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়, দৌলতপুর বিএল কলেজ, রাজশাহী সরকারী কলেজে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ ভর্তি হন। কিন্তু জেলে বন্দি থাকার কারণে এম. এ পরীক্ষা দিতে পারেননি। একজন বামপন্থী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু। ছাত্রজীবনে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ছাত্রলীগের ঝিনাইদহ মহকুমা শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে ঝিনাইদহ হতে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। ’৫৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ’৫৫ সালে সাহিত্য মজলিসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৫৬ সালে রাজশাহী সরকারী কলেজের নির্বাচিত হন ভিপি। ’৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। ’৬১ সালে গ্রেফতার হন। ’৬২ সালে থেকে বের হয়ে ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেন।

তিনি ছাত্র রাজনীতির সময়ই সাংবাদিকতা শুরু করেন। ’৬৫ সালে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। একই সালে ন্যাপের অল পাকিস্তান সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ’৬৮ সালে ন্যাপ দু’ভাগ হয়। ভাসানী যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ’৬৯ সালে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।’ ৭৭ সালে পুনরায় ন্যাপ নতুনভাবে পুনর্গঠন করা হলে তিনি ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। ’৭৮ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান বীরউত্তমের নেতৃত্বে ৫ দলের সমন্বয়ে ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট গঠিত হয়। তিনি ঐ ফ্রন্টে যোগ দেন। একই সালে আনোয়ার জাহিদ ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের শাসনমলে যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। ’৮৬ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে কিছুদিন ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ’৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ’৮৯ সালে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এনডিপি গঠন করেন। ’৯১ সালে বিএনডিপি গঠন করেন এবং দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। একই সালে ১০টি দলের সমন্বয়ে এনডিএ গঠিত হয়। তিনি এ-ফ্রন্টের সেক্রেটারী জেনারেল নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৬ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। শুধু রাজনীতি নয়, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের এই সাবেক নেতা সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন।

১৯ বছর বয়সে তিনি যখন ছাত্রনেতা, তখন দৈনিক ইত্তেহাদের সহকারী সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। ’৫৮ সালে অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতুর সহকারী সম্পাদক, ’৫৯ সালে দৈনিক সংবাদের সহকারী সম্পাদক, ’৬০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক, ’৬৩ সালে সাপ্তাহিক জনতার সম্পাদক, ’৬৬ সালে ইংরেজী সাপ্তাহিক হলিউডে’র উপ-সম্পাদক, ’৭০ সালে সাপ্তাহিক গণবাংলার নির্বাহী সম্পাদক, ’৭২ সালে ইংরেজী পত্রিকা ডেইল দ্যা পিপলস-এর নিউজ এডিটর এবং ’৭৭ সালে বাংলাদেশ টাইমস-এর নিউজ এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ কাজ করেন দৈনিক ইনকিলাব-এ।

সাংবাদিক জীবনে আনোয়ার জাহিদ শুধু সাংবাদিকতা করেননি সাংবাদিকদের নেতৃত্বেও দিয়েছেন। ’৬২, ’৬৩, ৬৪ সালে তিনি ডিইউজের সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। ’৬৫, ’৬৬ সালে তিনি ডিইউজের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ’৭৮, ’৮৩ সালে একই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং দায়িত্ব পালন করেন।

বর্ষীয়ান এই জননেতার ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সকাল ১১ টায় মীরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর কবরে বিভিন্ন এনডিপিসহ রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পন ও ফাতেহা পাঠ করবেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক আনোয়ার একই দিন জননেতা আনোয়ার জাহিদ স্মৃতি সংসদ কবরস্থান প্রাঙ্গনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
আনোয়ার জাহিদের মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনায় এনডিপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আনোয়ার জাহিদের বর্ণাঢ্য জীবন-ইতিহাস তুলে ধরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগমীর বলেছিলেন, ৫০-৬০ এর দশকে যেসব নেতারা দেশে প্রগতিশীল আন্দোলন করেছেন, তাদের মধ্যে আনোয়ার জাহিদ ছিলেন পথিকৃৎ। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বতন্ত্র পরিচিতির বিষয়ে তিনি কখনোই আপস করেননি। মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তিনি এ শিক্ষা পেয়েছিলেন।

সাবেক মন্ত্রী জামাল হায়দার বলেছেন, আনোয়ার জাহিদ আজীবন আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে ও মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে গেছেন উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, তার মতো মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান নেতার প্রয়োজন জাতি সব সময় অনুভব করবে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করি। তিনি বেঁচে থাকলে গণতন্ত্রকামী মানুষ উপকৃত হতেন। তার শুন্যতা পুরণ হওয়ার নয়। আনোয়ার জাহিদকে সব্যসাচী রাজনীতিবিদ আখ্যায়িত করেন সাবেক এই মন্ত্রী। ক্রান্তিকালে তিনি জাতীয়তবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।

আনোয়ার জাহিদ বলতেন, দেশের রাজনীতিতে দুটি ধারা বিদ্যমান। একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের শক্তি, অন্যটি আধিপত্যবাদীদের দোসর। তার এই বিশ্বাস জাতি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে।

এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা বলেছেন, জাতির ক্রান্তিকালে আনোয়ার জাহিদ সাহসী ভূমিকা রেখে দেশকে রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯৬ সালে যখন বেআইনীভাবে প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা কথিত জনতার মঞ্চ করলেন তখন আনোয়ার জাহিদ সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে সমাবেশ করার পরামর্শ দেন। তার পরামর্শে এইচটি ইমাম ও মহিউদ্দিন খান আলমগীরের মতো ব্যাক্তিরা প্রেস ক্লাব পর্যন্ত নিজেদের গুটিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিল।

তার থ্রি ইউনিটি তত্ত্বের কারণে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল জয়ে পরবর্তীতে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলেও ক্ষমতায় এসে আনোয়ার জাহিদের যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। ফলে রাজনীতি থেকে কিছুটা আড়ালে চলে যান তিনি। যখন তিনি হাসপাতালে শয্যাশায়ী তখন কোনো জাতীয়তাবাদী শীর্ষ নেতাকে তার পাশে দেখা যায়নি। তার প্রতি যে অবহেলা দেখানো হয়েছে তা জাতীয়তাবাদী শক্তিকে দুর্বল করেছে। আজ যখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সার্বভৌমত্ব হারাতে বসেছে, ট্রানজিট-কড়িডোর ও সমুদ্রবন্দর সুবিধা প্রদানসহ প্রতিবেশীদের ওপর যেভাবে নির্ভরশীলতা বাড়ছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের ষড়যন্ত্র চলছে। এ অবস্থায় দেশের ভবিষ্যত নিয়ে দেশবাসী শংকিত। এই পরিস্থিতিতে দেশ বাঁচাতে বর্তমান রাজনীতিকদের আনোয়ার জাহিদের আদর্শকে ধারণ করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, শুধু নির্বাচিত হলেই একটি সরকার গণতান্ত্রিক হয় না। নির্বাচিত সরকার যখন জনগনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে তখন তারাও স্বৈরাচারে পরিণত হয়। যখনই গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে তখনই আনোয়ার জাহিদের প্রয়োজনীয়তা জাতি উপলব্ধি করে। বর্ষীয়ান জননেতা আনোয়ার জাহিদ ২০০৯ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকার গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। আনোয়ার জাহিদের মৃত্যুর খবরে ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ. এম. এম. বাহাউদ্দীন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ, জাতীয় পার্টি মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি ১ পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক।

এবারের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জননেতা আনোয়ার জাহিদ স্মৃতি পরিষদ। ১২ই জুন সকালে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ, কোরআনখানি, স্মরণ সভা ও মিলাদ ও ইফতার।

লাইভবার্তা/জিএম/১২ জুন, ২০১৮

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY