অবশেষে বিএনপিকে নিয়ে ড. কামালের ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’

8

নিজস্ব প্রতিবেদক :
বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেনের ঐক্যের চেষ্টা সফল হয়েছে। জাতীয় ঐক্য নামে এই আলোচনা চললেও শেষমেশ এর নাম রাখা হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবে ফ্রন্টের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করা হয়, যেখানে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কামাল হোসেন, জেএসডির আ স ম আবদুর রব এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।

জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট নামে জোটবদ্ধ বিকল্প ধারার সভাপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এই সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন না। একই সময় তিনি বারিধারার বাসভবনে আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে এই ঐক্যকে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতাবিরোধীর ঐক্য আখ্যা দেন তিনি।

কামাল হোসেন এবং বি. চৌধুরী দুই জনই বলেছিলেন, বিএনপি জামায়াত না ছাড়লে ঐক্য নয়। তবে বিএনপি জামায়াত ছাড়েনি, তবু কামাল হোসেন ঐক্য গড়লেন।

আবার যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যানের অমতে ঐক্য গড়লেন তার দুই শরিক রব ও মান্না। দৃশ্যত যুক্তফ্রন্টেরও অবসান হলো, যদিও এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি এখনও।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা দেন নাগরিক ঐক্যের মান্না। পরে কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আ স ম আবদুর রব, কামাল হোসেন, মওদুদ আহমদ, জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের উপদেষ্টা মইনুল হোসেন প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি ও ১১টি লক্ষ্যের ঘোষণা দেয়া হয়। দাবির মধ্যে আছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ভোটের ১০ দিন আগে থেকে সেনা মোতায়েন, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক মামলা স্থগিত প্রভৃতি।

লক্ষ্যের মধ্যে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালনা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, বেকারত্ব দূর করা, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন গড়া, জঙ্গিবাদ দমন প্রভৃতি।

কামাল হোসেন বলেন, ‘জনগণ সুষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন চায়, আর জনগণের দাবি আদায় করতে যদি গুলি করাও পিছ পা হব না।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘জাতি আজকে গণতন্ত্রবিহীন, স্বৈরাচারের অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করে চলেছে। সেই জাতির মুক্তির জন্য গণমানুষের আন্দোলনের নতুন সূচনা।’

আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন জীবনে কোনোদিন ষড়যন্ত্র করে নাই। আমি নিজেও ষড়যন্ত্র করি নাই, ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করি না, ষড়যন্ত্রকারীদের ক্ষমাও নাই। আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। আমাদের দাবি মেনে নিলে অবশ্যই নির্বাচনে যাব।’

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশ দুঃসহ পরিস্থিতিতে আছে। ১৬ কোটি মানুষের ওপর সিন্দাবাদের ভূতের মতো একটা স্বৈরাচারের ভূত চেপে বসে আছে। আমরা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য চেষ্টা করছি।’

ঐক্যের আলোচনায় মধ্যস্ততা করা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘মানুষ আজ পরিবর্তন চায় এ জন্য যে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে, পরিবর্তন চায় এই জন্য যে মানুষ সুলভে চিকিৎসা, বাসস্থান চায়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে। যেখানে কোনো প্রতিহিংসা থাকবে না, গায়েবি মামলা হবে না, মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

ঐক্যের আলোচনা যেভাবে এগিয়েছে
এই ঐক্য গড়তে বিএনপি চলতি বছরের শুরুর দিক থেকেই চেষ্টা চালিয়ে আসছে। আর ২০১৬ সাল থেকে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নামে আলাদা উদ্যোগ নেন কামাল হোসেন। একই বছরের শেষ দিকে তৃতীয় শক্তি হওয়ার ঘোষণা দিয়ে গঠন হয় যুক্তফ্রন্ট, নেতৃত্বে থাকেন বিকল্প ধারার চেয়ারম্যান বি. চৌধুরী।

যুক্তফ্রন্টে থাকার কথা ছিল কামাল হোসেনেরও। কিন্তু তাকে বিদেশে রেখেই জোটের ঘোষণা হয়। আর এতে অসন্তুষ্ট হন গণফোরাম নেই। প্রায় দুই বছর পর গত ২৮ আগস্ট জোট বাঁধেন কামাল হোসেন ও বি. চৌধুরী।

এর মধ্যে ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন হয়, যেখানে আবার বি. চৌধুরীর অনুপস্থিতি নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, যুক্তফ্রন্ট নেতা অসুস্থ।

পরে এই তিন পক্ষের মধ্যে ঐক্য হতে পারে- এই বিষয়ে প্রথম আভাস পাওয়া যায় ২২ সেপ্টেম্বর। সেদিন কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশে যোগ দেয় বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট। ঘোষণা আসে এক সঙ্গে কাজ করার।

তবু বিএনপির সঙ্গে বাকিদের ঐক্য হবে কি না, এ নিয়ে নানা সংশয় ছিল। এই অবস্থায় মধ্যস্ততার দায়িত্ব পান বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি জামায়াতকে রেখেই ঐক্যের একটি সূত্র বের করেন।

‘ঐক্য বিএনপির সঙ্গে, তাদের জোটের সঙ্গে নয়’- এই সূত্র বের করেন জাফরুল্লাহ। আর এতেই কাজ হয়। যদিও এর মধ্যে বি. চৌধুরী ছিটকে যান ঐক্যের প্রক্রিয়া থেকে।

আগের দিনই উত্তরায় আ স ম আবদুর রবের বাসায় বৈঠক থেকে ঘোষণা এসেছিল আজ বৈঠক শেষে আসবে চূড়ান্ত ঘোষণা। কিন্তু এই বৈঠক নিয়েই বাঁধে গোল।

ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় আমন্ত্রণ পেয়ে এসে ফিরে যান বি. চৌধুরী, তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরী। বাসার দরজাও কেউ খোলেনি।

ততক্ষণে ঐক্যের আলোচনায় থাকা অন্যরা বৈঠকে বসে গেছেন কামাল হোসেনের মতিঝিলের চেম্বারে আর বি. চৌধুরীকে বলা হয়, তিনি চাইলে যেতে পারেন সেখানে। কিন্তু এতে ‘অপমানিত’ বি. চৌধুরী ফিরে যান বারিধারায় তার বাসভবনে।

সন্ধ্যায় যখন জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ঐক্যের ঘোষণা দেয়া হয় তখন বি. চৌধুরী পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, তিনি যেসব শর্তে ঐক্য চেয়েছিলেন, তা পূরণ হয়নি। এই ঐক্য পরোক্ষভাবে হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীর সঙ্গে।

বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে এই ঐক্য হয়েছে বলেও মনে করে বিকল্পধারা। আর ভবিষ্যতে এই ঐক্যে না থাকার ঘোষণাও দেয় দলটি।

লাইভবার্তা/ জিএম / ১৪ অক্টোবর, ২০১৮

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY